শিক্ষাঙ্গন কি আন্দোলনের কারখানা, নাকি মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান?

প্রফেসর ড. সাঈদা রেহানা

২০২৪ সালের আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, ক্ষমতার ঔদ্ধত্য, জনমতের প্রতি অবহেলা এবং একটি বিতর্কিত বক্তব্য সেই আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলেছিল। ছাত্র-জনতা তখন রাস্তায় নেমেছিল, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল পরিবর্তন দরকার। ইতিহাসে সেই অধ্যায়ের স্থান থাকবে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন আজ আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়—একটি সফল আন্দোলনের স্মৃতি কি এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করবে, যেখানে সামান্য মতবিরোধ হলেই প্রথম স্লোগান হবে, “পদত্যাগ চাই”? স্কুল, কলেজ, বা বিশ্ববিদ্যালয় কখনো প্রতিদিনের আন্দোলনের মঞ্চ হতে পারে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে যুক্তি প্রতিবাদের আগে কথা বলে, সংলাপ সংঘাতের আগে আসে এবং জ্ঞান আবেগকে পথ দেখায়। আন্দোলন গণতন্ত্রের শক্তি, কিন্তু আন্দোলন যদি অভ্যাসে পরিণত হয়, তবে সেটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে।

একজন শিক্ষক হিসেবে প্রতিদিন যে বাস্তবতা দেখি, তা আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। দেখছি অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় প্রশ্নের নম্বর ঠিকভাবে লিখছে না (পাঁচ নম্বর প্রশ্নের উত্তর লিখছে ছয় নম্বরে), উত্তরপত্রের প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করছে না, অতিরিক্ত খাতার নম্বর মূল খাতায় উল্লেখ করছে না। নকলের প্রবণতা বাড়ছে, AI ও স্মার্টফোনের অপব্যবহার উদ্বেগজনক। অথচ তাদের প্রত্যাশা—উচ্চ সিজিপিএ, দ্রুত পাশ এবং নিশ্চিত সাফল্য।

আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা সংগ্রামের ভাষা জানে, কিন্তু অধ্যবসায়ের ভাষা ভুলে যাচ্ছে?

তাদেরকে মনে রাখতে হবে, সিজিপিএ চাকরির দরজা খুলতে পারে; কিন্তু জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও চরিত্রই মানুষকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে। শর্টকাটে ডিগ্রি পাওয়া যায়, কিন্তু যোগ্যতা অর্জন করা যায় না।

অন্যদিকে, প্রশাসনেরও আত্মসমালোচনা জরুরি। ক্ষমতার ভাষা নয়, সংলাপের ভাষা ব্যবহার করতে হবে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতিটি বক্তব্য হতে হবে পরিমিত, বিবেচনাপ্রসূত এবং সময়োপযোগী। আজকের প্রজন্ম আবেগপ্রবণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল, তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও মানবিকতার বিকল্প নেই।

আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দুটি বিষয়— আত্মসংযম এবং আত্মসমালোচনা। শিক্ষার্থীকে বুঝতে হবে, অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কর্তব্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রশাসনকে বুঝতে হবে, নেতৃত্ব মানে কেবল সিদ্ধান্ত দেওয়া নয়; আস্থা তৈরি করাও নেতৃত্বের অংশ।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল শাসক পরিবর্তনে বদলায় না; বদলায় শিক্ষার মান উন্নয়নে, গবেষণায়, নৈতিকতায়, দক্ষতায় এবং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির মাধ্যমে।

আসুন, আমরা এমন একটি শিক্ষাঙ্গন গড়ি যেখানে প্রতিবাদ থাকবে, কিন্তু তা হবে যুক্তিনির্ভর; মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা হবে শালীন; অধিকার থাকবে, কিন্তু কর্তব্যও সমানভাবে পালন করা হবে।

কারণ আন্দোলন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু শিক্ষা ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করে।
(আজকে ছাত্রদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আমার ভাবনাগুলো)

লেখক : শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (ফেসবুক ওয়াল থেকে)

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন